Press Release Day-2

Bhajan Khapa

সিলেটে বেঙ্গল সংস্কৃতি উৎসব

দ্বিতীয় দিনে উপচেপড়া ভিড়

মানবিক সাধনায় বেঙ্গল সংস্কৃতি উৎসবের গতকাল বৃহস্পতিবার ছিল দ্বিতীয় দিন। বেলা চারটা থেকেই তাই দর্শনার্থীরা একে একে আসতে থাকেন উৎসবস্থলে। সন্ধ্যার দিকে হাজারো দর্শনার্থীদের উপস্থিতিতে মুখর হয়ে ওঠে নগরের মাছিমপুর এলাকার আবুল মাল আবদুল মুহিত ক্রীড়া কমপ্লেক্স। উৎসবস্থলের হাসন রাজা মঞ্চ, সৈয়দ মুজতবা আলী মঞ্চ, শাহ আবদুল করিম চত্বর, গুরুসদয় দত্ত চত্বর এবং রাধারমণ দত্ত বেদিÑসবখানেই ছিল উৎসুক মানুষের ভিড়। উৎসবে গতকালই যুক্ত হয়েছে ‘কিডস কর্ণার’। এখানে শিশুদের নানা ধরনের খেলার ব্যবস্থা রয়েছে। সবমিলিয়ে এ যেন সংস্কৃতির এক অনন্য উৎসবে পরিণত হয়েছে।

গতকাল বেলা চারটায় সৈয়দ মুজতবা আলী মঞ্চে শুরু হয় জাহিদুর রহিম অঞ্জনের ‘মেঘমল্লার’ চলচ্চিত্রটি। একই মঞ্চে সন্ধ্যা সোয়া সাতটায় মণিপুরি থিয়েটার মঞ্চায়ন করেছে ‘কহে বীরাঙ্গনা’ মঞ্চনাটক। মাইকেল মধুসূদন দত্তের কাব্যে এ নাটকের সম্পাদনা ও নির্দেশনা দিয়েছেন শুভাশিস সিনহা। নাটকটিতে একক অভিনয় করেছেন জ্যোতি সিনহা। এ ছাড়া সংগীতে ছিলেন শর্মিলা সিনহা। নাটকের কাহিনি, অভিনয় ও আলোক প্রক্ষেপণ মুগ্ধ করে রাখে নাট্যামোদী দর্শকদের।

‘কহে বীরাঙ্গনা’ মঞ্চনাটক

এদিকে সন্ধ্যা ছয়টা ২০ মিনিটে যখন মঞ্চে কুষ্টিয়া অঞ্চলের বিশিষ্ট লোকসংগীত শিল্পী ভজন খ্যাপা ওঠেন, তখন মাঠভর্তি দর্শক করতালিতে তাঁকে স্বাগত জানায়। তিনি প্রথমেই লালন সাঁইয়ের ‘গুরু আমারে কি রাখবেন করে চরণদাসী’ গান পরিবেশন করেন। এরপর তিনি বেশ কতগুলো অধ্যাত্ম ও দেহতত্ত্ব পর্যায়ের গান পরিবেশন করেন। তাঁর গাওয়া গানের মধ্যে ‘নামাজ আমার হইল না আদায়’, ‘আমি কাঙাল হব মেঙে খাব’, ‘যদি ত্বরিতে বাসনা থাকে, ধরো রে মন সাধুর সঙ্গ’, ‘সাধুর সঙ্গ গুণে’, ‘তোমার দিল কি দয়া হয় না’ উল্লেখযোগ্য।

ভজন খ্যাপার পরিবেশনা

ভজন খ্যাপার পরিবেশনার পর বেঙ্গল পরম্পরা সংগীতালয়ের শিল্পীরা দলীয় যন্ত্রসংগীত (তবলা) পরিবেশন করেন। এসব শিল্পীদের পরিবেশনা ছিল মনোমুগ্ধকর। মাঠভর্তি মানুষ তন্ময় হয়ে উপভোগ করেন বেঙ্গল পরম্পরার শিল্পীদের তবলা বাদন। বিমুগ্ধ শ্রোতাদের ভাষ্য, শিক্ষার পর্যায়েই যন্ত্রসংগীত শিল্পীরা যেভাবে বাদ্যে শ্রোতাদের অভিভ’ত করেছে, ভবিষ্যতে নিশ্চয়ই তাদের পরিবেশনা দেশ ছাড়িয়ে সারা বিশ্বের শ্রোতাদেরও মুগ্ধ করে রাখবে।

বেঙ্গল পরম্পরা সংগীতালয়ের শিক্ষার্থীদের পরিবেশনার পরই মঞ্চে আসেন ভারতের বিশিষ্ট শিল্পী মনোময় ভট্টাচার্য। তিনি শোনান নজরুলসংগীত ও আধুনিক গান। সবশেষে মঞ্চে আসেন দেশের অন্যতম জনপ্রিয় লোকসংগীত শিল্পী চন্দনা মজুমদার ও শতাব্দী রায়। তাঁরা সিলেটসহ দেশের নানা অঞ্চলের প্রখ্যাত লোকগীতিকারদের গান পরিবেশন করেছেন। তাঁদের গানের তালে তালে নেচে-গেয়ে ওঠেন মাঠভর্তি কয়েক হাজার সংগীতপ্রিয় মানুষ।

বেঙ্গল পরম্পরা সংগীতালয়ের তবলা শিল্পীরা

আজকের আয়োজন : সকাল সাড়ে ১০টায় সৈয়দ মুজতবা আলী মঞ্চে ‘কালি ও কলম সাহিত্য সম্মেলন’-এর উদ্বোধন হবে। উদ্বোধনী পর্বের পর ‘সমকালীন বাংলা সাহিত্যের রূপরেখা ও সম্ভবনা’, ‘সমাজবাস্তবতা ও বাংলাদেশের সাহিত্য’, ‘সাহিত্যে ঐতিহ্যচেতনা ও স্বরূপসন্ধান’ এবং ‘সাহিত্যে নারীজীবন’ শীর্ষক চারটি সেমিনার অনুষ্ঠিত হবে। সেমিনারে বাংলাদেশ ও ভারতের বিশিষ্ট লেখকেরা অংশ নেবেন। সন্ধ্যা ছয়টা ২০ মিনিটে হাসন রাজা মঞ্চে বর্ণালী চট্টোপাধ্যায় পরিবেশন করবেন রাগাশ্রয়ী বাংলা গান। এরপর বিশিষ্ট সংগীতশিল্পী সুবীর নন্দী ও ঝুমা খন্দকার পরিবেশন করবেন নজরুলসংগীত ও সেকালের বাংলা গান। সবশেষে জীবনমুখী গান পরিবেশন করবেন কৃষ্ণকলি ও তাঁর দল।


ভজন খ্যাপা

উল্লেখ্য, বেঙ্গল ফাউন্ডেশনের উদ্যোগে আয়োজিত ১০ দিনব্যাপী এ উৎসব চলবে ৩ মার্চ পর্যন্ত। পুরো উৎসবটি উৎসর্গ করা হয়েছে জ্ঞানতাপস আব্দুর রাজ্জাককে। ইনডেক্স গ্রুপ নিবেদিত এ উৎসবের সহযোগিতায় রয়েছে ঢাকা ব্যাংক। সম্প্রচার সহযোগী চ্যানেল আই। প্রতিদিনই কয়েকটি মঞ্চে অনুষ্ঠান হবে। মূল অনুষ্ঠান হবে সৈয়দ মুজতবা আলী এবং হাসন রাজা মঞ্চে। এ ছাড়া প্রথম দিন থেকেই শাহ আবদুল করিম চত্বরে বাদ্যযন্ত্র ও সিলেট অঞ্চলের লোকগানের ইতিহাস নিয়ে প্রদর্শনী; গুরুসদয় দত্ত চত্বরে কারুমেলা ও বেঙ্গল প্যাভিলিয়ন এবং কুশিয়ারা কলোনেডে স্থাপত্য প্রদর্শনী শুরু হয়েছে। রাধারমণ দত্ত বেদিতে অনুষ্ঠিত হচ্ছে সুবীর চৌধুরী আর্ট ক্যাম্প।

দশ দিনব্যাপী এ উৎসবে রেজওয়ানা চৌধুরী বন্যা, খায়রুল আনাম শাকিল, কুদ্দুস বয়াতীসহ বাংলাদেশের ৩৮৩ জন সংগীতশিল্পী-নৃত্যশিল্পী-চিত্রকর-নাট্যকুশলী-লেখক-কবি অংশগ্রহণ করবেন। সংগীত পরিবেশন করবেন ভারতীয় শিল্পী হৈমন্তী শুকলা, শ্রীকান্ত আচার্য্য, জয়তী চক্রবর্তী ও পার্বতী বাউল। বিশিষ্ট চিত্রকর রফিকুন নবী, মনিরুল ইসলাম, শহিদ কবির, রোকেয়া সুলতানা, জামাল আহমেদ, শিশির ভট্টাচার্য্য, তৈয়বা লিপিসহ ২৭ জন শিল্পী উৎসব চলাকালীন ‘সুবীর চৌধুরী আর্ট ক্যাম্পে’ অংশগ্রহণ করবেন।


কহে বীরাঙ্গনা’ মঞ্চনাটক

বিশিষ্ট কথাসাহিত্যিক হাসান আজিজুল হক, ইমদাদুল হক মিলন, শাহীন আখতার ও হরিশংকর জলদাস, প্রাবন্ধিক সিরাজুল ইসলাম চৌধুরী, সনৎকুমার সাহা, মুহম্মদ জাফর ইকবাল ও শামসুজ্জামান খান,কবি রবিউল হুসাইন, রুবি রহমান, তারেক সুজাতসহ বাংলাদেশের মোট ৫০ জন কবি ও লেখক কালি ও কলম সাহিত্যসভায় অংশ নেবেন। প্রথিতযশা মঞ্চ-অভিনেতা ও নির্দেশক শাঁওলি মিত্রসহ ভারতের ২৩ জন প্রাবন্ধিক, কবি ও সাহিত্যিক এবং নেপালের ২ জন বিশিষ্ট লেখক সাহিত্যসভায় যোগ দেবেন।

উৎসবে বাংলাদেশের ১০টি জেলার কারুশিল্প নিয়ে রয়েছে কারুমেলা। চলচ্চিত্র উৎসবে মোরশেদুল ইসলামের ‘অনিল বাগচীর একদিন’, তারেক মাসুদের ‘রানওয়ে’, ঋত্বিক ঘটকের ‘তিতাস একটি নদীর নাম’, রুবাইয়াৎ হোসেনের ‘আন্ডার কনস্ট্রাকশন’ ও ছোটদের ছবিসহ মোট ১৪টি ছায়াছবি নিয়মিতভাবে প্রদর্শিত হবে।

মঞ্চায়িত হবে নন্দিত মঞ্চনাটক সুবচনের ‘মহাজনের নাও’, থিয়েটার আর্ট ইউনিটের ‘আমেনা সুন্দরী’ এবং লোকনাট্যদলের ‘কঞ্জুস’। উৎসব প্রাঙ্গণে উপস্থাপিত হচ্ছে বাংলাদেশের প্রসিদ্ধ মিষ্টান্ন ও ঐতিহ্যবাহী খাবার। রয়েছে প্রথমা এবং বেঙ্গল পাবলিকেসন্সের বইয়ের স্টল। সিলেট জেলার ঐতিহ্যবাহী ঝুমুর, ধামাইল, সুফি ও সাধনসংগীত, চা জনগোষ্ঠি, মণিপুরী ইত্যাদি আঞ্চলিক গান ও নাচ উৎসবের বিভিন্ন দিন মঞ্চে উপস্থাপন করা হবে। সিলেটের ঐতিহ্য ও উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য নিয়ে রয়েছে স্থিরচিত্র প্রক্ষেপণ (ডিজিটাল ডিসপ্লে)। সিলেট শহরকে আরো পরিবেশ ও মানববান্ধব করার বিভিন্ন প্রয়াস ও চিন্তা সমন্বয় করে উপস্থাপন করা হচ্ছে স্থাপত্যবিষয়ক প্রদর্শনী।